Home Art & Culture বছর ঘুরে আবার এসেছে শারদীয় দুর্গোৎসব!

বছর ঘুরে আবার এসেছে শারদীয় দুর্গোৎসব!

Courtesy- Pinterest

শরত সকাল হিমেল হাওয়া
আনমনে তাই হারিয়ে যাওয়া
কাশফুল আর ঢাকের তালে
শিউলি নাচে ডালে ডালে
মা এসেছেন বছর ঘুরে
পুজোর হাওয়া তাই জগত জুড়ে ।

বছর ঘুরে আবার এসেছে বাঙালি হিন্দু সমাজের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। আমরা সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

শুরু হয়েছে বাঙালির প্রাণের উৎসব, দুর্গাপূজা। দুর্গাপূজা মানেই সার্বজনীন উৎসব, দেবী দুর্গা আমাদের মধ্যে মাতৃরূপে বিরাজ করেন, সবার মা। মা সন্তানের সুরক্ষাদায়িনী, সব অপশক্তি বিনাশিনী, মুক্তিদায়িনী, আনন্দময়ী দুর্গা। মায়ের কাছে সব সন্তান সমান, সব সন্তানের কাছে মা অনন্য, তাই মা দুর্গা সর্বজনের, দুর্গাপূজা সার্বজনীন।

তবে মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে এবার নেই তেমন কোনো সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জা। থাকছে না বিজয়া দশমীতে বিজয়ার শোভাযাত্রা। অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ এবং ভোগআরতিও আয়োজিত হবে সীমিত পরিসরে।করোনার কারণে দুর্গাপূজায় উৎসব সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পরিহার করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাত্ত্বিক পূজায় সীমাবদ্ধ থাকায় এবারের দুর্গোৎসবকে কেবল দুর্গাপূজা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দেবী দুর্গার স্থানও পরম ভক্তিময়। তাঁর এক রূপ অসুরবিনাশী, আরেক রূপ মমতাময়ী মাতার। তিনি অসুরদের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে অন্যায়-অশুভর বিপরীতে ন্যায় ও শুভশক্তির জয় হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। তিনি কেবল সৌন্দর্য-মমতা-সৃজনের আধারই নন, অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয় বলেও গণ্য হন। মানবকুলের জন্য তিনি বয়ে আনেন মঙ্গলবার্তা।দুর্গোৎসব আনন্দ-মিলনের উৎসবও বটে। আর সে আনন্দ ধর্ম সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের সবাইকে কাছে ডেকে নেয়। দুর্গোৎসব হয়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ সামাজিক উৎসব। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় এই উৎসবকে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি কেন্দ্রীয় উৎসব হিসেবে দেখে থাকে।

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দিনগু‌লোই দেবীপক্ষ।আর দেবীপ‌ক্ষে দেবীর আগমনী গানে মেতে ওঠে মানুষের মন। এই দেবীপক্ষ ঢাকের শব্দ, না‌রিকেলের নাড়ু, লাড্ডু, লুচি, বাহা‌রি রকমের ফল,‌ মিষ্টি, নতুন জামাকাপড়ের স্পর্শ দেয় আমাদের অস্তিত্বে।পূজার দিন মানেই সকালে ঘুম থেকে ওঠা। স্নান করে নতুন জামা কাপড় পরে মায়ের দুয়ারে​ যাওয়া। অষ্টম‌ীর দিনে অঞ্জ‌লি দেওয়া, কুমারী পূজা দেখা। সন্ধ্যায় মায়ের সন্ধ্যা আরতীতে ঢাকের তালে দুই হাতে ধুন‌চি নিয়ে মঙ্গল আরতীতে মেতে উঠা।মহামারির কারণে এ বৎসর অবশ্যই সবকিছু সীমিত তবে সে ভয়ে কম্পিত নয় উৎসবপ্রিয় বাঙালির হৃদয়।

ষষ্ঠী পূজার দিনে দেবী দুর্গা চার ছেলেমেয়ে গণেশ, লক্ষ্মী, কার্তিক ও সরস্বতীকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীতে আসেন, এই পৃথিবীতেই উনার পিতার বাড়ি। ষষ্ঠী পূজার সন্ধ্যায় মূলত মূর্তির উপর থেকে ঢাকা সরিয়ে দেওয়া হয়, কুমোর তুলির এক টানে দেবী দুর্গার চোখ অাঁকেন, যাকে বলা হয় ‘দৃষ্টিদান’।আর এই দেবীর চক্ষুদান দিয়ে শুরু হয় পূজার দিনগুলো। মা যেন চক্ষু মেলে নতুন করে আমাদের দেখেন। অধীর হ‌য়ে চোখের দিকে তা‌কিয়ে দে‌খি। এই চোখ সারা দু‌নিয়াটাকে দেখে রাখছে! ভাব‌তেই গায়ে শিহরণ লাগে।

সপ্তমীতে কলা গাছের চারাকে গনেশের স্ত্রী কল্পনা করে সাজানো হয়। ভোর হওয়ার আগেই সেই কলা বউকে স্নান করিয়ে, লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে গনেশ মূর্তির পাশে স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে এদিনই দেবী দুর্গার নয়টি রুপের প্রতীক হিসেবে নয় ধরনের গাছ (নবপত্রিকা) একত্রিত করা হয়। মহা সপ্তমীর সকালে নিকটস্থ নদী বা জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে নবপত্রিকাকে স্নান করানো হয়। নতুন শাড়ি পরিয়ে দেবী দুর্গার ডান দিকে নবপত্রিকাকে কাঠের সিংহাসনে বসানো হয়। এরপর মহাস্নানের মাধ্যমে দুর্গোৎসবের মূল অনুষ্ঠানের প্রথাগত সূচনা হয়। দুর্গা প্রতিমার সামনে দর্পন রেখে (কখনও জল ভর্তি কলস রেখে) তাতে প্রতিফলিত প্রতিবিম্ব শুদ্ধ দল দিয়ে স্নান করানো হয়।

অষ্টমী পূজাতে দিনের পূজায় কল্পারম্ভ, মহাস্নান শেষে অষ্টমী পূজা হয়, এই দিনে ‘কুমারী পূজা’ হয় যেখানে বালিকাকে দেবী দুর্গারূপে আরাধনা করা হয়, মহাষ্টমীতে ভক্তরা দেবীর চরণে ফুল, বেলপাতার অঞ্জলি দান করে। মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্ধি পূজা করা হয় (সন্ধি : অষ্টম দিনের শেষ এবং নবম দিনের শুরু)। মহিষাসুর বধযুদ্ধে সন্ধির এ ক্ষণেই দেবি দুর্গা চামুণ্ডা বা কালীমূর্তির রূপ ধারণ করেছিলেন।

অষ্টমী আর নবমীর স‌ন্ধিক্ষণে হয় স‌ন্ধিপূজা।অষ্টম‌ীর সন্ধি পূজার সমাপ্তি পর্ব থেকেই মহানবমী শুরু হয়।নবমীতে ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে দেবী দুর্গার পুজা করা হয়।নবমীতে দেবীকে ‘অন্নভোগ’ সাজিয়ে দেওয়া হয়, ভক্তদের জন্যও পঙ্ক্তি ভোজের আয়োজন করা হয়, পাড়ামহল্লায় খিচুড়ি, লাবড়া, চাটনি, পায়েস, সন্দেশের মহোৎসব লেগে যায়।

দশমীতে ভক্তকুলের মনে বিষাদের ছায়া নেমে আসে, স্বর্গ থেকে মা এসেছিলেন তার সন্তানদের মাঝে, মা আবার ফিরে যাবেন স্বর্গে, ভেবে ভক্তকুলের চোখ ভিজে ওঠে, মন ভারি হয়। দশমী পূজার আয়োজনে আড়ম্বর থাকে না, মঙ্গলঘটের জলে দেবীকে প্রতীকী বিসর্জন দেওয়া হয়, বিসর্জন হয়ে গেলে বউ ঝিয়েরা লাল পেড়ে শাড়ি পরিধান করে সিঁদুর, মিষ্টি, ধান দুর্বায় থালা সাজিয়ে দেবী মূর্তির সামনে হাজির হয়। মা’কে কপালে সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে, মিষ্টিমুখ করিয়ে, ধানদুর্বা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনিতে চারদিক মাতিয়ে তুলে, চোখের জলে ভেসে এয়োস্ত্রীরা মা’কে প্রণাম করে মায়ের চরণে সিঁদুরের কৌটা ছুঁইয়ে স্বামী সন্তানের মঙ্গল প্রার্থনা করে। এরপরই বিসর্জনের ঢাক বেজে উঠে, ঢাকের বোলে বাজে, ‘ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন।’ দেবীমূর্তিকে খোলা ট্রাকে বসিয়ে ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে ভক্তদের মিছিল বের হয়। সারা পাড়া, সারা শহর প্রদক্ষিণ শেষে মা’কে ‘গঙ্গারূপী যে কোনো জলাশয়ে (নদী, পুকুর, বিল, হাওর) বিসর্জন দেওয়া হয়। সেদিন থেকে আবার নতুন করে আগামী বছরের জন্য দিন গোনা শুরু হয়।

পৃথিবীতে আজ প্রতি নিয়ত করোনা রূপী অশুভ শক্তির সাথে শুভ শক্তির লড়াই চলছে। তারই মধ্যে মা দুর্গার আগমনী বার্তা যেন শান্তির বানী নিয়ে আসে। মঙ্গলময়ী মা-এর কাছে আমাদের এই প্রার্থনা তিনি যেন করোনা রূপী অশুভ শক্তির হাত থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষা করেন।তাছাড়া সব রকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে যথাযথ উৎসবমুখর পরিবেশে যেন দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে এটাই কামনা রইল।